কম্পিউটার :
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে (1940এ) মহান বিজ্ঞানীদের নিরন্তর এবং একনিষ্ঠ গবেষণার ফলস্বরূপ যেসব যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কম্পিউটার। বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর মানসপুত্র আজ একধারে বিদ্যালয় হাসপাতাল মহাকাশ গবেষণা শিল্প চিকিৎসা বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনন্য ও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। কম্পিউটার আবিষ্কারের ফলেই আমরা পৃথিবীতে হাতের মুঠোয় আনতে সক্ষম হয়েছি। এই কারণে আধুনিক যুগকে কম্পিউটারের যুগ বলা হয়।
কম্পিউটার শব্দটি এসেছে কম্পিউট শব্দ থেকে, যার অর্থ গণনা অর্থাৎ কম্পিউটার একটি গণক যন্ত্র বা পরী গণক কিন্তু কার্যকারিতা বা কার্যক্ষমতা প্রয়োগ সীমা ও যন্ত্রাংশ ইত্যাদি দিক থেকে বিবেচনা করলে কম্পিউটার শুধুমাত্র একটি গণক যন্ত্র নয়।
কম্পিউটারের সংজ্ঞা:
কম্পিউটার হল দ্রুত গতি সম্পন্ন একটি জটিল বৈদ্যুতিক যন্ত্র যা সংশ্লিষ্ট বিবিধ যন্ত্রাদির সহযোগিতায় সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত তথ্য কি পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং নির্দেশাবলী মেনে নিদির্ষ্ট প্রসেসিং এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধাপে ধাপে বিভিন্ন গাণিতিক যৌক্তিক ও অন্যান্য তথ্য নিপুণভাবে পরিচালনা করে ব্যবহারকারী সামনে ফলাফল তুলে ধরতে পারে।
কম্পিউটার উদ্ভবের ইতিহাস:
বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি অন্যতম বিস্ময়কর আবিষ্কার হলো কম্পিউটার। বর্তমান দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে শুরু করে তথ্যের আদান-প্রদান গবেষণা বিনোদন বাণিজ্য শিক্ষা শিল্প কলকারখানা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের এই মানসপুত্রের উপস্থিত লক্ষ্য করা যায়। তবে বর্তমানে যে কম্পিউটার গুলি দেখা যায় সেগুলি একদিনে তৈরি হয়নি। অনেক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই রূপ পেয়েছে।
আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে চীন দেশে অ্যাবাকাস নামক যন্ত্র তৈরীর মধ্যে দিয়ে প্রথম গণক যন্ত্রের উদ্ভাবন হয়। এই যন্ত্রের সাহায্যে কেবলমাত্র ছোট ছোট যোগ, বিয়োগ করা সম্ভব হয়েছিল। তবে এই যন্ত্রের দ্বারা সরাসরি গুণ ও ভাগ প্রক্রিয়া সম্ভব ছিল না। গুন প্রক্রিয়া যোগ এবং ভাগ প্রক্রিয়া বিয়োগ এর মাধ্যমে সম্পন্ন হত।
এরপর অ্যাবাকাস ক্রমশ রাশিয়া গ্রিস, ইতালি, জাপান প্রভৃতি বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হয়। জাপানে ব্যবহৃত এই অ্যাবাকাস যন্ত্রকে সরোবান বলা হত।
এর অনেক বছর পর 1617 খ্রিস্টাব্দে জন নেপিয়ার একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্রে রেখাঙ্কিত দন্ড ছিল। এগুলি হাড় দিয়ে তৈরি বলে এই যন্ত্রটি কে নেপিয়ারস বোন বা নেপিয়ারের হাড় বলা হত। এর সাহায্যে বড় বড় গুণ করা সম্ভব হতো।
এরপর 1620 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ গণিতজ্ঞ উইলিয়াম অট্রেড এবং অন্যান্য বিজ্ঞানী মিলিতভাবে স্লাইড রুল যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্রটি জন নেপিয়ার এর তৈরি যন্ত্রের উপর ধারণা করে তৈরি করা হয়েছিল। স্লাইড রুল বা স্কেলের সাহায্যে প্রথমের দিকে গুন ভাগ এবং পরে বর্গমূল, লগারিদম ত্রিকোণমিতি প্রভৃতি নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছিল।
1642 খ্রিস্টাব্দে ব্লেস পাস্কাল একটি মেকানিকাল ক্যালকুলেটর তৈরি করেন। এই যন্ত্রের সাহায্যে খুব বড় বড় যোগ বিয়োগ গুন ভাগ প্রভৃতি সম্পাদন করা সম্ভব হত। এইটি কে প্রথম ক্যালকুলেটর হিসাবে ধরা হয়। পাস্কাল এর নামানুসারে এই যন্ত্রটি কে পাস্কালিন বলা হত।
এরপর পাস্কালিন যন্ত্রের প্রভূত উন্নতি সাধন করে 1672 খ্রিস্টাব্দে জার্মান বিজ্ঞানী গডফ্রেড উইলিয়াম লিবনিজ একটি ডিজিটাল মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর আবিষ্কার করেন যা স্টেপড রেকনার নামে পরিচিতি ছিল।
1821 খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ বিজ্ঞানী চার্লস ব্যাবেজ ডিফারেন্স ইঞ্জিন নামক এক ধরনের গণক যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্রটি তথ্য ধরে রাখতে পারতো এবং একাধিক কাজ একসঙ্গে করতে সক্ষম ছিল।
এরপর 1834 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী ব্যাবেজ একটি সম্পূর্ণ নতুন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের উদ্ভাবন করেন। এই যন্ত্রটি ডিফারেন্স ইঞ্জিন থেকে অনেক উন্নত মানে। যন্ত্রটি যেকোনো গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম ছিল। এই যন্ত্রটির নাম দেওয়া হয়েছিল অ্যানালাইটিক্যাল ইঞ্জিন।
বিজ্ঞানী ব্যাবেজ অ্যানালাইটিক্যাল ইঞ্জিন পাঁচটি অংশের ছিল।
বর্তমানে আধুনিক কম্পিউটারের নকশা জন ভন নিউম্যান প্রবর্তিত ধারণা উপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছে। ভন নিউম্যান মতে কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ করার জন্য স্বতন্ত্র যন্ত্রাংশ থাকবে। তিনি Stored Programme এর ধারণা আবিষ্কার করেন।
কম্পিউটারের প্রকারভেদ:
আবিষ্কারের সময় থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার বিভিন্ন কাজের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
অ্যানালগ কম্পিউটার:
যে সকল কম্পিউটার ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ডেটা পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হয় তাকে অ্যানালগ কম্পিউটার বলে। এই ধরনের কম্পিউটারে ডেটার বা তথ্যের সঠিক ফলাফল পাওয়া যায় না।
উদাহরণ: স্লাইড রুল,স্টেপড রেকনার ইত্যাদি।
ব্যবহার: ১)বৈদ্যুতিক তারের ভোল্টেজের ওঠানামা পরিমাপ করার জন্য ব্যবহৃত হয়।২) চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইসিজি এই ধরনের কম্পিউটার ব্যবহৃত হয়।
বৈশিষ্ট্য: ১) ক্রমাগত পরিবর্তনশীল কোন বস্তু বা পদার্থের ভৌত অবস্থার পরিমাপ করা হয়।২) এই ধরনের কম্পিউটারের সংরক্ষন করার ক্ষমতা কম হয়।
ডিজিটাল কম্পিউটার:
যে সকল কম্পিউটার ডিজিটাল সংকেত দ্বারা পরিচালিত হয় তাকে ডিজিটাল কম্পিউটার বলে। ডিজিটাল কম্পিউটারে তথ্য হিসাবে 1 অর্থাৎ অন এবং 0 অর্থাৎ অফ ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: বর্তমানে ব্যবহৃত ডেস্কটপ ল্যাপটপ সবাই ডিজিটাল কম্পিউটারের উদাহরণ।
ব্যবহার: ১) সমস্ত ধরনের অফিস ওয়র্কের জন্য ব্যবহৃত হয়। ২) ডেটা প্রসেসিং এর কাজে ব্যবহৃত হয়। ৩) বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সূক্ষ্ম ও সঠিক ফলাফল নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
বৈশিষ্ট্য: ১) এই সিস্টেমে সমস্ত তথ্য অন বা অফ দ্বারা প্রকাশিত হয়। ২) এই কম্পিউটারে সূক্ষ্ম ও সঠিক ফলাফল নির্ণয় সম্ভব।৩) এই সিস্টেমে ধারাবাহিকহীন তথ্য নিয়ে কাজ করে।
হাইব্রিড কম্পিউটার:
যে সমস্ত কম্পিউটারে অ্যানালগ ও ডিজিট্যাল উভয় ধরনের গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্য বর্তমান থাকে তাকে হাইব্রিড কম্পিউটার বলে।
উদাহরণ:XPC-100,রোবট,HYDC-2400,Hycomp-258 ইত্যাদি।
ব্যবহার: আবহাওয়ার পূর্বাভাস, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ ইত্যাদি নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
বৈশিষ্ট্য: ১) এই ধরনের কম্পিউটারে দু’ধরনের তথ্য বা সংকেত ই একধরন থেকে অন্য ধরনের পরিবর্তন সম্ভব। ২) এই ধরনের কম্পিউটার খুবই দ্রুত এবং সঠিক ফলাফল নির্দেশ করতে পারে। অ্যানালগ এবং ডিজিটাল উভয় ধরনের বৈশিষ্ট্যই এতে বিদ্যমান।
সুপার কম্পিউটার:
সুপার কম্পিউটার সবচেয়ে বৃহৎ, শক্তিশালী, দামি এবং উচ্চগতিসম্পন্ন। এই ধরনের কম্পিউটারের তথ্য ধারণক্ষমতাও বেশি।
উদাহরণ: Cray-3, Cyber-205,CDC-7600,PARAM ইত্যাদি।
ব্যবহার: ১) বৈজ্ঞানিক কাজকর্মে সুপার কম্পিউটার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।২) তেল এবং গ্যাস অনুসন্ধান করতে ব্যবহৃত হয়।
বৈশিষ্ট্য: ১) সুপার কম্পিউটার দ্রুত তথ্য প্রেসিং করতে সক্ষম। ২)64 বিট বা ততোধিক মাইক্রোপ্রসেসর চিপ ব্যবহৃত হয়। ৩) সুপার কম্পিউটারে প্রসেসিং স্পিড হল MIPS।